বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ:

১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় হচ্ছে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশন

ডেস্ক রিপোর্ট | কক্সবাজার9 October 2026 | ২ মিনিটে পড়ুন👁 1,718 বার পড়া

কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। বিদ্যমান কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ে গঠিত হতে পারে প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশন। সব মিলিয়ে এর আয়তন হবে প্রায় ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার।


কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের স্বাক্ষরিত গত ৩১ আগস্টের গণবিজ্ঞপ্তিটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে কক্সবাজার পৌরসভা এবং ঝিলংজা, খুরুশকুল, পিএমখালী, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নের নির্দিষ্ট এলাকা এবং সংশ্লিষ্ট ১২টি মৌজার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রস্তাবিত সীমানা অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভার ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার, ঝিলংজার ২০, খুরুশকুলের ২৩ দশমিক ৬৭, পিএমখালীর ২৭ দশমিক ২৫, দক্ষিণ মিঠাছড়ির ১৮ এবং খুনিয়াপালংয়ের ৪৭ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যপত্রে প্রস্তাবিত এলাকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


এর আগে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্প্রসারিত এলাকার আয়তন, জনসংখ্যা ও পৌরসভার সার্বিক তথ্য সংবলিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথিতে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়য়া, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী ও প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরানের স্বাক্ষর রয়েছে।


জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন-২ শাখার গত ১২ আগস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা, ২০১০-এর বিধি-৫-এর উপবিধি (২) অনুসরণ করে এ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।


গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের সীমানা ও অন্তর্ভুক্ত এলাকা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি বা মতামত থাকলে তা গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো আপত্তি গ্রহণ করা হবে না। প্রস্তাবিত এলাকার মৌজা ও দাগ নম্বরের বিস্তারিত বিবরণও গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।


এদিকে সিটি কর্পোরেশন গঠন নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান এ বিষয়ে নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, সিটি কর্পোরেশনের আওতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি এলাকার দাবি নয়, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, আইন-বিধিমালা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।


তিনি বলেন, নাগরিকদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে। আইন-কানুন ও বিধিমালা অনুযায়ী কক্সবাজারের মানুষের জন্য যেটি সবচেয়ে ভালো ও কল্যাণকর হবে, সরকার সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।


জেলা প্রশাসক আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশনের আওতায় কোনো এলাকা যুক্ত হলে রাস্তা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ফি, হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য রাজস্ব প্রদানের বিষয়ও থাকবে। ফলে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্ব ও সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।


তিনি বলেন, রামু, খুরুস্কুল, বাহারছড়া, দক্ষিণ মিঠাছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার বিষয়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য কোন সিদ্ধান্ত সবচেয়ে কল্যাণকর হবে, সেটিই গুরুত্ব পাবে।


দীর্ঘদিন ধরে পর্যটননগরী কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার দাবি রয়েছে। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পৌরসভা সময়ের সঙ্গে আয়তন ও জনসংখ্যায় বিস্তৃত হলেও ক্রমবর্ধমান নগরবাসী ও পর্যটকদের চাহিদার তুলনায় নাগরিক সেবার পরিধি বাড়েনি-এমন অভিযোগ রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন হলে পরিকল্পিত নগরায়ন, সড়ক যোগাযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা শুধু প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, নাগরিক সেবা, রাজস্ব ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উন্নয়ন, নাগরিক স্বার্থ, আর্থিক সক্ষমতা এবং বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


কক্সবাজারের জন্য সিটি কর্পোরেশন শুধু একটি নতুন প্রশাসনিক পরিচয় নয়-এটি হতে হবে পরিকল্পিত, টেকসই ও জনকল্যাণমুখী নগর ব্যবস্থার ভিত্তি। মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয়ে সরকার এমন একটি সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে কক্সবাজারের পর্যটন, অর্থনীতি ও নাগরিক জীবন-তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত হয়।


এদিকে কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বলছেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার পরও কক্সবাজারে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত হয়নি। বরং পৌরবাসী দীর্ঘদিন ধরে নানা নাগরিক সমস্যা ও অব্যবস্থাপনায় ভুগছেন।


তাদের মতে, একদিকে পৌরসভার কর ও রাজস্ব আদায় নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে, অন্যদিকে গঠিত হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এখনো পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান না হওয়ায় তাদের কার্যক্রমের পরিধি ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্টতা তৈরি হয়নি। কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে এবং পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের সীমারেখা কী হবে—এ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।


নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর করা হলে হয়তো নাগরিক সেবার পরিধি বাড়তে পারে। তবে এর বিপরীতে বাড়তে পারে কর, ফি ও অন্যান্য রাজস্বের বোঝাও। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সাধারণ নাগরিকদের ওপরই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


তাদের অভিমত, এই মুহূর্তে কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরের চেয়ে বিদ্যমান পৌরসভার নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা বেশি জরুরি। একই সঙ্গে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে পরিকল্পিত নগরায়ণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করাই এখন বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।


এ বিষয়ে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘আলোচনা-সমালোচনা, যুক্তি-তর্ক ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতেই প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণ করা হবে বলে আশা করি। শুধু আয়তন বা পরিধি বাড়িয়ে সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণ করা সহজ হলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে কৃষকসহ প্রান্তিক মানুষের ব্যয় বাড়ছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’


তিনি বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের সীমানা একসঙ্গে বাড়ানো হয়নি; বরং পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভার পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিকদের প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির আগ্রহ ইতিবাচক। তবে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাদযোগ্য জমি, লবণ মাঠ, মৎস্যঘেরসহ তাদের জীবিকা ও জীবনমান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।