দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি এবং জনপ্রতি ১০০ টাকা ‘পরিবেশ ফি’ আরোপকে কেন্দ্র করে বিতর্ক শুর হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার জাহাজভাড়া ৭০০ টাকা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪,২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।পর্যটকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের নামে আদায় করা ১০০ টাকার ফি কতটা যৌক্তিক এবং এর অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।অন্যদিকে জাহাজ পরিচালনার ব্যয় বিবেচনায় না নিয়ে শুধু ভাড়ার অঙ্ক দেখে সমালোচনা করা ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীদের এক নেতা আকতার নুর। তার ভাষ্য, ডকিং, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, লাইসেন্স, অনুমতি ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক পর্যটক দাবি করছেন, বাড়তি ভাড়া তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে জাহাজ পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ।গণমাধ্যমকর্মী শামসুল আলম শ্রাবণ ‘পরিবেশ ফি’ নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, ‘চাঁদাবাজির নতুন নাম পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। সেন্টমার্টিনে যেতে হলে পর্যটককে জনপ্রতি ১০০ টাকা দিতে হবে। কী তামাশা শুরু করল এরা?’ছাত্রদল নেতা সাহাব উদ্দিন বলেন, গত বছর জাহাজভাড়া ছিল ৩,৫০০ টাকা, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৪,২০০ টাকা। তার অভিযোগ, জাহাজ সিন্ডিকেটই কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। তবে জাহাজ পরিচালনাকারীদের মধ্যে যোগসাজশ বা সিন্ডিকেটের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভাড়া বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পরিচালন ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সমালোচনার জবাবে আকতার নুর বলেন, জাহাজের ডকিং বাবদ ১০ লাখ নয়, কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। এছাড়া ১২ মাসের ভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদই প্রায় চার কোটি টাকা খরচ করতে হয়।তিনি জানান, ডকিং ও বেতনের বাইরে রক্ষণাবেক্ষণ, অফিস পরিচালনা, এজেন্ট কমিশন, ভয়েজ লাইসেন্স, বিআইডব্লিউটিএর নৌপথ সংরক্ষণ ফি, এমএমডির সার্ভে সনদ, জেলা প্রশাসনের অনুমতি এবং একাধিক অফিস পরিচালনায়ও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়।আকতার নুরের দাবি, সব খাতের ব্যয় যোগ করলে মোট অর্থের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, সেই অর্থ দিয়ে একটি ছোট আকারের লঞ্চ কেনা সম্ভব। সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কিছু নতুন সাংবাদিক প্রবাদটি ভুলে গেছেন—আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ নিচ্ছে তাই।’তবে সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো বলছে, জাহাজ পরিচালনাকারীদের ব্যয়ের এ দাবির বিষয়ে বিস্তারিত আর্থিক নথি প্রকাশ করা হলে ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে জাহাজের ধারণক্ষমতা, আসনপ্রতি ভাড়া, মৌসুমভিত্তিক যাত্রীসংখ্যা এবং পরিচালন ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাব পর্যালোচনা করে ভাড়ার যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব। এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও খতিয়ে দেখতে পারে।পরিবেশ ফি নিয়ে স্বচ্ছতার দাবিসেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত না থাকলেও জনপ্রতি ১০০ টাকা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ফি’ আদায়ে সরকারি ভিত্তি, অর্থ নির্ধারণের পদ্ধতি এবং সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হবে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা দাবি করেছেন সমালোচকরা।তাদের বক্তব্য, পরিবেশ রক্ষার নামে অর্থ আদায় করা হলে সেই অর্থের ব্যবহার, বাস্তবায়িত সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং এর ফলাফল সম্পর্কে জনসাধারণকে স্পষ্ট তথ্য জানাতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।সমালোচকদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ যেন পর্যটকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে ফি আদায়ের যৌক্তিকতা ও বাস্তব প্রভাব মূল্যায়নের আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই মনে করেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটনশিল্পের বিকাশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাই একদিকে জাহাজ পরিচালনাকারীদের প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব যাচাই, অন্যদিকে ভাড়া ও ফি নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।সেন্টমার্টিনের জন্য অপেক্ষা বাড়ছেএদিকে ১ নভেম্বরের থেকে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হলেও নির্ধারিত দিন থেকেই পর্যটকরা সেখানে যেতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ছাড়পত্র ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ফলে দ্বীপে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া পর্যটকদের জাহাজ চলাচল শুরুর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং জেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না মেলায় এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। মানচিত্রদেখুনতবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললে আগামী ৪ অথবা ৫ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।গতকাল সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে মতবিনিময় সভা শেষে এসব তথ্য জানা যায়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী
জাহাজভাড়া বাড়ল ৭০০ টাকা, দিতে হবে ‘পরিবেশ ফি

শেয়ার করুন



